ঠিক ভোর সাড়ে ৫টায় পাপড়ির মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটল- সেই বিকৃতির মাত্রা *হীরামন স্কেলে"(পাগলামী পরিমাপক কাল্পনিক স্কেল)১০০ এর কাছাকাছিই হবে বোধকরি; নইলে এই কুসময়ে(!) সে আমার ফ্ল্যাটে আসবে কেন? সে কি জানে, মাত্রই ভোর পৌনে পাঁচটায় বিছানামুখো হওয়ার পরিণতিতে সৃষ্ট আমার ‘ভ্রুণঘুমটার’ বয়স ১ঘণ্টা পেরুনোর আগেই ঘুমের কেমন করুণ মৃত্যু ঘটল!অথচ, আমি কোনরূপ ক্ষোভ বা বিস্ময় প্রকাশের সুযোগ তো পেলাম-ই না, উপরন্তু ঘরে ঢুকেই তার প্রথম উচ্চারিত বাক্যটি হল- ‘এতবেলা পর্যন্ত ঘুমায় মানুষ!’
তার এই ‘গেরিলা ভ্রমণের’ কারণ জানতে বিলম্ব ঘটলনা- তার সঙ্গে আমাকে একজায়গায় যেতে হবে, সে রীতিমত তৈরি হয়েই এসেছে। আমার ঘুমার্ত মস্তিষ্ক পুরো পরিস্থিতিটা বোঝারও সুযোগ পেলনা তার হাকডাকে-‘কী ব্যাপার, এত দেরি করছো কেন?আরে কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি, এসব উত্তর এখনই দিলে সারা রাস্তাতো মুখে ‘স্কার্ভি রোগ’ নিয়ে বসে থাকতে হবে- যেতে যেতেই বলি নাহয়; ৭টার সময় আমাদের বাস ছাড়বে।খাওয়া-দাওয়ার চিন্তা একদমই কোরোনা এখন, সব ব্যবস্থা আমি করে রেখেছি’।
আজ থেকে পুরো ১মাসের জন্য ভার্সিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার খুশিটা অনুভব করারও ফুসরত পেলাম না পাপড়ির এই কোর্টমার্শালসুলভ আচরণে। ‘পৃথিবীর সব মেয়েরাই কখনো না কখনো নারী, শুধুমাত্র একজনই পাপড়ি বোধহয়’-অবশেষে এভাবেই নারী আর পাপড়ির পার্থক্য করতে করতে বাথরুমে চলে গেলাম হাত-মুখ ধুয়ে সেমি-সভ্যমানুষের চেহারায় প্রত্যাবর্তন করতে।
পাপড়ির ব্যাগটিকে বাইরে থেকে যতই নিরীহদর্শন লাগুক, ভুল করে একবার হাতে নিলে এর মাহাত্ম্য বোঝা যাবে ওজনে ; বলতে গেলে একটা ভ্রাম্যমাণ সংসারের প্যাকেজ সংস্করণ এই ব্যাগটি : ক্যামেরা, ওযাকম্যান, দুজনের জন্য দুইটি ডায়েরি, কলম, খাবার, পানির বোতল, মোবাইল চার্জার- একটা সংসারে আর কী লাগতে পারে!পক্ষান্তরে, আমি কপর্দকশূন্য দশায়, এমনকি হাতে একটা ঘড়িও নেই; প্রেমিকা, প্রেমিকের সঙ্গে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে, এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত আমাদের জানা ; কেন জানিনা আজ মনে হচ্ছে আমারও বেচারী প্রেমিকাতে রূপান্তর ঘটেছে।
বাসে উঠার একটু পরই আমাদের গন্তব্য, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্বন্ধে অবগত হয়েছি, এবং যথারীতি আমার আক্কেলগুড়ুম হয়েছে।
আমরা যাচ্ছি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে, পাপড়ির এক বান্ধবীর বাসায়। সেই বান্ধবীর বড়চাচা একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা; তার মুখে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃতগল্প শুনে রেকর্ড করে রাখবো- প্রাথমিক উদ্দেশ্য এটাই। এটা শোনার পর থেকেই ভ্রমণের আনন্দ নিদারুণ বিবমিষায় পরিবর্তিত হয়েছিল- আরে, মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনার জন্য এতদূর যাওয়ার প্রয়োজন কী, চাইলে ঢাকাতে কি তা অসম্ভব ছিল?তবে, আমার এই ক্ষণিক বিবমিষা পাপড়ির প্রতি অপরিমেয় শ্রদ্ধায় রূপ নেয় এই একমাস ছুটি কাটানোর ব্যাপারে তার বিস্তারিত পরিকল্পনাটা শোনার মুহূর্ত থেকেই : গত ২মাস ধরে সে নাকি বান্ধবী ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে তাদের এলকার স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ঠিকানা সংগ্রহ করেছে, এই বন্ধে প্রতিদিন সে এভাবে একেকজন মুক্তিযোদ্ধার মুখে যুদ্ধের বাস্তব গল্প শুনবে, এবং আশ্চর্যজনক হচ্ছে, এই কাজটি করবে বলেই গত ২মাসের টিউশনির পুরো টাকাটা সে জমিয়ে রেখেছে ।এটা জানার পর, এক পশলা অভিমান শরতের বৃষ্টি হয়ে মনের আকাশকে ভিজিয়ে দিল - এতদিনের পরিকল্পনা তার, অথচ আমি জানলাম বাসে উঠার পরে; আগে জানলে আমিও কি বিশেষ প্রস্ততি নিতে পারতাম না?হায় ভালবাসা, পাপড়ির কাছে তোমার সংজ্ঞা আসলে কী, সেই প্রশ্ন কখনো রেখেছো?
‘হঠাৎ কেন এমন খেয়াল হল’- জানতে চেয়ে জবাব পেলাম- ‘আসলে মুক্তিযুদ্ধের নাটক-সিনেমা-উপন্যাসগুলোকে আমার পুরোপুরি বস্তুনিষ্ঠ মনে হয়না, অধিকাংশকেই কাল্পনিক ও অনুমাননির্ভর লাগে। তাই, ভাবলাম প্রকৃত মানুষদের থেকেই সত্যি ঘটনাগুলো জানি’।
‘কিন্তু এতদিন পর তারাও তো অতিরঞ্জিত কাহিনী বলতে পারে’-আমার এই আশঙ্কার প্রেক্ষিতে সে একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস নিল, এরপর ধীরে ধীরে বলল – তা পারে, তবুও একজন সত্যিকারের যোদ্ধার মুখ থেকেই নাহয় অতিরঞ্জিত গল্প শুনলাম’।
আমাদের পৌছতে দুপুর বারোটা বেজে গেল, তবে আসার উদ্দেশ্য কতটা সফল হবে বোঝা মুশকিল, কারণ বান্ধবীর চাচাটিকে যেরকম দেখলাম তাতে তার মুখে যুদ্ধের গল্প শুনতে চাওয়াটা বিদ্রূপের শামিল হবে : ভদ্রলোকের বয়স ৬০+, পক্ষাঘাতগ্রস্ততায় মুখ একদিকে আনত হয়ে গেছে, সেইসঙ্গে যদ্ধে পা হারানোর সুবাদে সার্বক্ষণিক অবলম্বন হুইলচেয়ার- এর কাছে কী করে জানতে চাইবো যুদ্ধের গল্প? ইনি নিজেই তো একটি বিধ্বস্ত যুদ্ধক্ষেত্র!
শুধুমাত্র যুদ্ধের গল্প শুনতে এতদূর কষ্ট করে এসেছি , এটাকে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য লাগেনি সম্ভবত এই পরিবারটির কাছে, তাই ব্যবহারে আন্তরিকতার ঘাটতিটা মুমূর্ষুভাবে চোখে পড়ল।পরে অবশ্য পাপড়ির সেই বান্ধবীর মুখে মূল ব্যাপারটি জানলাম: ওর চাচার পক্ষাঘাতগ্রস্ততার পর থেকেই পরিবারটি নানা দুর্ঘটনায় বিপর্যস্ত, চাচাতো ভাইরাও আলাদা সংসার নিয়ে ব্যস্ত, চাচা-চাচী বেঁচে আছেন ছেলেদের গলগ্রহ হয়ে, এমতবস্থায় ওদের আগমনটা উটকো ঝামেলাই বাড়িয়ে দিয়েছে। তবুও, সেই বান্ধবীর বদৌলতে তার চাচীর সঙ্গে কথা বলতে পারলাম, এবং সেখানে মুক্তিযুদ্ধকে ছাপিয়ে জীবনযুদ্ধই ঘুরেফিরে আলোচনায় আসল।এদের কাছে ৭১ এখন এক বিস্মৃত সুদূর অতীতের নাম!
ফিরতি যাত্রায় বাসে তেমন কোন কথা হলনা আমাদের; আমি ডায়েরি উল্টে চাচীর বয়ান পড়তে লাগলাম, পাপড়ি কানে হেডফোন লাগিয়ে ওয়াকম্যানে ধারণ করা সেই বয়ান শুনতে লাগল। একপর্যায়ে, কান থেকে হেডফোন খুলে বলল, ‘আজকের মত এভাবেই তুমি সবকিছু লিখে রাখবে, আর আমি রেকর্ড করবো; মাস শেষে আমার আসল উদ্দেশ্য জানাবো’- এরপরে বাসজুড়ে ‘নীরবতা দিবস’ পালিত হয়েছিল মহাসমারোহে!
প্রায় প্রতিদিনই আমরা নতুন কোন জেলায় যাচ্ছি সেই অভিন্ন উদ্দেশ্যে, এতে করে ভ্রমণের একটা আনন্দ অন্তত পাচ্ছি, বিশেষত বাসে বসে থাকা সময়গুলো কাটানোর জন্য আবিষ্কৃত খেলাটি উপভোগ করছি সর্বাংশে; খেলার নাম ‘শব্দ বিনিময় খেলা’, খেলাটা এরকম : ধরা যাক, আমি একটা ইংরেজি শব্দ লিখলাম ‘heat’, এর শেষ অক্ষর যেহেতু ‘t’, তাই পাপড়িকে ‘ট’ দিয়ে কোন বাংলা শব্দ লিখতে হবে, ধরা যাক সে লিখল ‘টেকনাফ’, আমাকে তখন ‘f’ দিয়ে কোন ইংরেজি শব্দ লিখতে হবে, আমি লিখতে না পারলে পাপড়ি একটি পয়েন্ট পাবে, আর ‘ও’ তখন নতুন একটি শব্দ লিখবে; এভাবে আমাদের বাংলা-ইংরেজি শব্দচর্চাটা দারুণভাবে সময়ের চাতুর্যকে পরাস্ত করে সময়কে আমাদের অনুগামী করে রাখে বাস থেকে নামার আগ পর্যন্ত। এই খেলাটির ভিন্ন আবেদন সৃষ্টি হয়েছে আরও একটি কারণে : খেলায় হারলেই পরেরদিন ৭০টি নতুন শব্দ ডায়েরিতে লিখে নিয়ে যেতে হয় ; সারাদিন ঘোরাঘুরির পর রাতজেগে এভাবে শব্দ লেখার শাস্তি(!) কে পোহাতে চায়?সুতরাং ‘কোনভাবেই হারা চলবেনা’-এমন একটা সংকল্প থাকায় ভ্রমণের চেয়ে খেলাটিই মূখ্য হযে উঠছে ক্রমাণ্বয়ে!
২০দিনের মাথায় আমাদের এই গল্প শোনার মিশন সমাপ্ত হল।বলা বাহুল্য, যতটা উৎসাহ নিয়ে পাপড়ি কর্মসূচীটা শুরু করেছিল, শেষের দিকে এসে তার অনেকটাই ম্রিয়মান হয়ে গেছে_ প্রায় সর্বত্রই গল্প শুনতে গিয়ে গল্পের চেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের দীনহীন জীবনটাই মূল আলোচ্য হয়ে উঠেছে। ব্যস্ত নাগরিকজীবনে কফিতে চুমুক দিতে দিতে এতদিন ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটি শুনলে অদ্ভুত শিহরণ বইয়ে যেত প্রথমে ঠোটে, এরপর সেটি ছড়িয়ে পড়ত সমস্ত শরীরে। কিন্তু ২০দিনের ভ্রমণ সমাপ্তির মুহূর্তে কেবলই মনে হয়েছে-‘কোথাও একটা গণ্ডগোল আছে’।
অবশ্য দু-এক জায়গায় উল্টোচিত্রও দেখেছি, যেমন কিশোরগঞ্জে যে লোকের কাছে গল্প শুনতে গিয়েছিলাম, তার আচরণ-জীবনযাপনের ধরনে তাকে মুক্তিযোদ্ধা ভাবতে কুণ্ঠাবোধ করেছি, পরে ফেরার পথে জেনেছি তিনি একজন আদম ব্যবসায়ী।সার্বিক বিবেচনায়, ২-১টি ব্যতিক্রম বাদ দিলে অধিকাংশ গল্প কথক মুক্তিযোদ্ধার সামাজিক অবস্থান আমাকে লজ্জিত করেছে। বিশেষত, চৌদ্দগ্রামের সেই পক্ষাঘাতগ্রস্ত যোদ্ধাটির বেকে যাওয়া মুখ, চলৎশক্তিহীন বসে থাকা- আমার মস্তিষ্কে উল্কির ছাপ একে দিয়েছে যেন, চাইলেও মুছে ফেলতে পরছিনা।
ফিরতি যাত্রায় দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকার পর পাপড়ি আবার প্রগলভ হয়ে উঠল।‘ আচ্ছা আলভি, আজ কত তারিখ বলতে পারো?’-এমন প্রশ্নে আমি হকচকিয়ে ওর মুখের দিকে তাকালাম- সম্ভবত ২৭শে জুলাই; কেন?
কিছু না বলে, ব্যাগ থেকে সে তার ওয়াকম্যানটি বের করে আমার হাতে দিয়ে, পুনরায় কিছু একটা খোজায় মন দিল।ভিতর থেকে এবার সে একটি ছোট্ট ব্যাগ বের করে সেটিও আমার হাতে দিল- ‘এই রইল ওয়াকম্যান, আর এই ব্যাগটাতে এতদিন রেকর্ড করা সবগুলো গল্পের ক্যাসেট আছে। এবার, আমার উদ্দেশ্যটা বলি : এই ক্যাসেটের গল্পগুলো শুনে, আর মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনযাপন দেখে তুমি একটা উপন্যাস লিখবে, যার বিষয়বস্তু হবে আমাদের প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক দর্শন।অন্যদিকে, তুমি যে ডায়েরিটিতে এতদিন শোনা গল্পগুলো লিখে রাখতে সেটা আমি নিয়ে যাচ্ছি, ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলো তো আছেই। এই গল্পগুলো পড়ে, আমি এই প্রজন্মের চোখ দিয়ে যুদ্ধকে দেখে তার ছবি আকব, মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি আকব। কেমন হবে বল?
আমি একটু ঘাবড়ে গেলেও কথা খুজে পেলাম ঠিকই- ‘তোমার প্ল্যানটা নিঃসন্দেহে খুবই প্রশংসনীয় কিন্তু এইটুকু তথ্যের উপর ভিত্তি করে উপন্যাস লেখা, ছবি আকাটা, একটু বাগাড়ম্বরিতা হয়ে যাচ্ছেনা?
-না, তা হবে কেন?আমরা তো প্রকৃত মানুষদের থেকে তথ্য নিয়েছি,বাকিটা অনুভব থেকে লিখবে। তথ্যের প্রসঙ্গ তুললে তো, আমাদের প্রজন্মের এ বিষয়ে লেখার অধিকারই নেই, যেহেতু আমরা যুদ্ধই দেখিনি।
(কিছুক্ষণ নীরবতা)ওহ, আর একটা কথা, আজ থেকে আমাদের সকল প্রকার যোগাযোগ আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত বন্ধ থাকবে, এমনকি মুখোমুখি হয়ে গেলেও মুখ ঘুরিয়ে নেব অবলীলায়। আমি ইতিমধ্যে তোমার ফোন নম্বর মুছে দিয়েছি। তোমার উপন্যাস লেখা-আমার ছবি আঁকার সময়টাকে আমি একটি যুদ্ধ হিসেবে কল্পনা করে হৃদয় নিংড়ানো কষ্ট পেতে চাই; কাজ শেষ হলে পুনরায় কাছাকাছি হওয়ার স্বাধীনতা- ব্যাপারটার গভীরতা নিয়ে ভেবেছো? তাইতো একে প্রাণভরে আস্বাদন করবো বলেই, সাময়িক এই দূরে থাকার সংগ্রাম।
-এই কথাটির জবাব আমার জানা নেই। তাই বাকি সময়টুকু বাসের জানালা দিয়ে রাস্তার ধারের প্রকৃতির উশৃঙ্খলতা দেখাটাই আমার একমাত্র করণীয়; বাস থেকে শরীরটা নামলেই দুজন চেনা মানুষ আগামী বেশ কিছুদিনের জন্য স্বেচ্ছায় অচেনা হয়ে যাচ্ছি, এর প্রতিক্রিয়াটা কি প্রকৃতিতে দেখা যাবে?
আমাদের মধ্যেকার মানসিক দুরত্বটা বন্ধুমহলে সবারই দৃষ্টিগোচর হয়েছে, কারণ এখন আমি অধিকাংশ সময়ই ক্লাসের অন্য গ্রুপের সাথে কাটাই, পাপড়ির সামনাসামনি হলে পেন্টিয়াম ডি প্রসেসরের দ্রুততায় চম্পট দেই। সবাই চিন্তিত; মীমাংসারও অনেক উদ্যোগ নিয়েছে অনেকে, কিন্তু সমস্যাই যদি কোন সমস্যার মূল সমধান হয়, সেক্ষেত্রে কী মীমাংসা হবে!
আমার সহনশীল ক্ষমতায় নিজেই অভিভূত হয়ে যাচ্ছি দিনদিন।তবে, যে উপন্যাস লেখার জন্য এত আয়োজন করে দুরত্ব সৃষ্টি করা হল, সেই লেখার ব্যাপারে অগ্রগতি বা সন্তুষ্টি, কোনটাই আসছেনা; বারবার মনে হচ্ছে অপ্রয়োজনীয়, অর্থহীন সময় অপচয়- যুদ্ধের তীব্রতাটা কিছুতেই ধারণ করতে পারছিনা, প্রকৃত ইন্দ্রিয়াবেগিক তাড়নাও অনুভব করছিনা একটুও। তাই লেখার অক্ষরগুলোকে পতিতার হাসির মতই স্থূল বাণিজ্যিক মনে হচ্ছে। তবুও লিখে ফেলেছি অনেকটাই - মাইক্রোসফট ওয়ার্ডের হিসাবানুযায়ী এখন ৫৯ নম্বর পৃষ্ঠায় অবস্থান করছে লেখাটা, যদিও এটাকে পড়তে আমি নিজেই সংকোচ বোধ করছি; সারা লেখার কোথাও একবিন্দু মমতা নেই, এখন যুদ্ধগাথা লেখার এই কপট প্রয়াসের একটাই উদ্দেশ্য – পাপড়িকে ফিরে পাওয়া, nothing else!
২৭শে জুলাই থেকে ৭ই অক্টোবর_ হিসেব করলে ৭২ দিন হয়; সেই ৭ই অক্টোবর দিবাগত রাতেই ফোন আসল হঠাৎ, নম্বরটি ফোনবুকে সেইভ করা না থাকলেও স্ক্রিনে দেখেই জীবনের পরম কাঙ্ক্ষিত নম্বরটি চিনতে অসুবিধা হলনা,। কিন্তু, জানুয়ারী আসতে তো অনেক দেরি, তবে কি ভুলে ‘ইয়েস বাটনে’ চাপ লেগে কল চলে এসেছে?প্রথমবার রিং হতে হতে একসময় লাইন কেটে গেল , পরক্ষণেই ফোনের রিং শুনতে পেলাম আবার। ব্যাপার কী- আমি ঘামতে শুরু করলাম, তবুও দ্বিধা-দ্বন্দ্বের যূথবদ্ধতায় কম্পিত কণ্ঠে ‘হ্যালো’ বললাম
-‘হ্যালো আলভি, আমি, আমি’.- পাপড়ি রীতিমত হাপাচ্ছে। পুরান ঢাকার কিছু এলাকায় লাইনে দাঁড়িয়ে লোকজন পানি সংগ্রহ করে_ ওর কণ্ঠ শুনে মনেহল কথা বলার জন্য সুদীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে করতে যখন ওর ডাক আসল,ততক্ষণে আর জীবনিশক্তি অবশিষ্ট নেই কিছু। আমি ভয়ে কুকড়ে গিয়ে আতঙ্কমিশ্রিত কণ্ঠে বললাম- কী হযেছে তোমার পাপড়ি?প্লিজ, আমার কাছে কিছু লুকিয়োনা, তুমি এমন করছো কেন?’-পাপড়ির কোন কথা বলতে পারলোনা, শিশুদেরমত হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিল। আমি দুশ্চিন্তার কোমায় আচ্ছন্ন হলাম, এই রাতের বেলা কী করতে পারি আমি?
ভোর হতেই পড়িমড়ি করে পাপড়ির হলে চলে এলাম, মাত্র কয়েক ঘণ্টায় পম্পেই নগরী যেমন ধ্বংস হয়েছিল, একরাতের ব্যবধানে পাপড়ির মুখশ্রীও পম্পেইয়ে পরিণত হয়েছে তেমনিভাবে।
এখন সে অনেকটাই স্বাভাবিক আচরণ করছে; ধীরে ধীরে গতরাতের কাহিনী বলা বলা হল তার- ‘তুমি জানোনা আলভি, কী অমানুষিক পরিশ্রম করে গত ২মাসে যুদ্ধের ছবিগুলো একেছিলাম; কাল একটা ছবি আকছিলাম ধর্ষিতার লাশে শকুন ঠোকর দিচ্ছে এমন; আঁকার পর ছবিটার দিকে তাকাতেই মাথায় একটা চক্কর দিল - বিশ্বাস করো, শকুন নয়, আমি দেখছিলাম আমি-ই বিভৎস পৈশাচিকতায় সেই লাশের শরীরে ঠোকর দিচ্ছি। ভয় পেয়ে অন্য ছবিগুলো খুললাম, সেগুলোতেও হিংস্রতা ফুটে উঠল সহসাই। তখনই উপলব্ধি করলাম শিল্প বিদ্রোহ করেছে, তাই দেরি না করে সবগুলো ছবি পুড়িয়ে ফেলেছি। এরপরই মনে হল, পৃথিবীতে আমি এক নিঃস্ব-নিঃসহায মানুষ, মাথাটা পুরো ফাকা ফাকা লাগছিল, তখন কিভাবে যে তোমাকে ফোন করলাম খেয়াল নেই’; যাইহোক, ছবি পুড়েছে, ভাল হয়েছে; তোমার উপন্যাস কতদূর?
-‘এইতো, ২১১পৃষ্ঠা লিখেছি’ -অপরাধী কণ্ঠে এটুকুই বলতে পারলাম।
সবকিছু আবার স্বাভাবিক হওয়াতে ভাবছি উপন্যাস লেখার প্রহসনে এবার ইস্তফা দেব, কিন্তু ইতিমধ্যে৩৪৭ পৃষ্ঠা লেখা হয়ে গেছে।এটাকে তো এখন বই হিসেবে চালিয়েই দেয়া যায়, হোকনা শত অনীহায় লেখা।পাপড়িও বইয়ের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে সম্ভবত _ কথা প্রসঙ্গেও বইয়ের কথা জিজ্ঞাসা করেনা আর।কাল বলল, নতুন কী দায়িত্ব পেয়েছে একটা সংগঠন থেকে, আমার সাহায্য দরকার, আজ সে উপলক্ষে আমার এখানে আসবে বলেছে।
পাপড়ির এই নতুন দায়িত্বটা জেনে খুব একটা উৎসাহিত হতে পারলাম না : ওর রুমমেটের সুবাদে এই সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হয়েছে ‘ও’; সংগঠনটি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করছে গণজাগরণ তৈরির অংশ হিসেবে। পাপড়ির উচ্ছ্বাসের যেন সীমা-পরিসীমা নেই, আমাকেও স্বাক্ষর সংগ্রহ কাজে স্বেচ্ছাসেবক হতে হবে, এটাই তার বক্তব্য।
জীবনে এই প্রথম ওকে সরাসরি ‘না’ বললাম কোন প্রস্তাবে- ‘দেখ পাপড়ি,এটাকে আমার স্রেফ একটা ফ্যান্টাসি মনে হচ্ছে।মুষ্টিমেয় কিছু শহুরে শিক্ষিত মানুষ ছাড়া এই ব্যাপারে কারো সচেতনতা যে নেই তাতো এবারকার নির্বাচনেই দেখেছো- যুদ্ধাপরাধীদের মোট ভোট কিন্তু আগের থেকে বেড়েছে। এটা কী প্রমাণ করে?আমি এখনই স্বাক্ষর দিচ্ছি, তুমি একটু অপেক্ষা করলে আরও কয়েকজনের স্বাক্ষরও সংগ্রহ করে দিতে পারি, তবুও বলবো এটা পণ্ডশ্রম। তার চেয়ে, একটা সুখবর শোন: উপন্যাসটা প্রায় শেষ পর্যায়ে – ৪০৯ পৃষ্ঠা লেখা হয়েছে’
‘তোমার কেন মনে হচ্ছে এটা পণ্ডশ্রম?এই যে, তুমি মুক্তিযুদ্ধের বই লিখছো, অথচ নিজেই বিশ্বাস করোনা যে জনগণের সম্মিলিত দাবীর একটা জোর আছে। আমি যদি বলি, বই লেখাটা তোমার স্রেফ ভণ্ডামী...!’-পাপড়ি রেগে গেল সহসাই
-‘দেখ পাপড়ি, তুমি-আমি সমমনের বলেই কাছাকাছি হতে পেরেছি, তবে আমরা সমমতের ছিলাম না কখনই।তাই তোমার প্রথম প্রশ্নের ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। আর ২য় বক্তব্যের ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত; আমি আসলেই ভণ্ডামী করছি উপন্যাসটা নিয়ে। এমনকি, এটাকে আমি বই আকারে প্রকাশ করবো, ২-১জন প্রকাশকের সঙ্গে বথাও বলছি, তো কী হল?এখন সময়টাই ভণ্ডামীর পাপড়িমণি!
আমাদের আলোচনাটা দীর্ঘায়িত হয়নি, মেজাজ খারাপ করে পাপড়ি হলে ফিরে গেছে – যাওয়ার আগে স্বাক্ষর দিতে ভুল করিনি মোটেই।
আমাদের মধ্যে আদর্শগত বিরোধ দেখা দেয়ার পর থেকে বইটা লেখার ব্যাপারে অসুরিক তাগিদ অনুভব করছি, ভন্ডামীই যদি করি তবে আর রাখঢাক কেন?৪৫৭ পৃষ্ঠা লেখা হয়ে গেছে এ কয়দিনেই। প্রকাশকের সঙ্গে কথা হয়েছে, বইটি হবে ৫২০ পৃষ্ঠার, সর্বসাকুল্যে আমার ৩০হাজারের মত খরচ পড়বে। টিউশনির সূত্রে কিছু সঞ্চয় আছে, বাকিটা ধার, আর বাসা থেকে সংগ্রহ করতে হবে। আশা করছি, হয়ে যাবে; তাছাড়া এ মাসে দুটো নতুন টিউশনি ধরেছি।
পাপড়ির সঙ্গে এখনো আগের মতই সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছি। একসাথে ঘুরি, ফোনে নিয়মিত কথা বলি, প্রসঙ্গান্তরে ওদের সাংগঠনিক কাজের অগ্রগতি জানতে চাই, সে-ও আমার বইয়ের কথা জিজ্ঞাসা করে, প্রকাশনায় কত খরচ পড়বে, আমার কত আছে, এইসব ; দুজনের নিপুণ ভণ্ডামীতে দুজনেই মুগ্ধ হই হয়ত।
আজ সারাদিন প্রচণ্ড ব্যস্ততায় কেটেছে। সন্ধ্যায় ফ্ল্যাটে ফেরার পর গোসল করে কফিতে চুমুক দিতেই ক্লান্তি দূর হয়ে গেল, শরীরের ক্লান্তি গেলেও মনের ক্লান্তি যাবে কিভাবে?সুতরাং ফোনের ডানায় চড়ে পাপড়ির কাছে হৃদয় নিয়ে উড়ে যেতে ফোনটাকে ব্যস্ত করতেই হল:
-বইয়ের কাজ কতদূর এগুলো?
-প্রুফরিডিং শেষ,কাল প্রেসে যাচ্ছে। আমি চাই সেই মুহূর্তে তুমি আমার পাশে থাকো
-সেটা কি উচিৎ হবে? তাহলে তো নীতির প্রশ্নে আপোষ করা হয়ে গেল...
-মোটেইনা, তুমি তোমার মত থাকবে। আমার বইটা তোমাকে খুলে দেখতে হবেনা; তুমি শুধু স্মরণীয় মুহূর্তটায় আমার হাত ধরে রাখবে।তাছাড়া বইটা তোমাকেই উৎসর্গ করা হয়েছে যে!
-না, না এটা কিছুতেই হতে পারেনা।তুমি এমনটা করতেই পারোনা। দেখ মন-মেজাজ এমনিতেই খারাপ, তিক্ততা বাড়িয়ো না।
-কেন কী হয়েছে?
-কী আর হবে! গণস্বাক্ষর নিতে গিয়েও দলাদলি, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব,..
-হাহা হা। নচিকেতার একটা গান আছে এরকম :
‘থাকে জন ৩ জন বাঙালি- ১জন রাজনীতি করবেই
কেউ যদি উপরে উঠে, বাকিজন তাকে টেনে ধরবেই
ও বাঙালি, ও বাঙালি।
সে যা-ই হোক, আমি খুব ক্লান্ত, সারাদিন ব্যস্ত ছিলাম তো। কাল তুমি অবশ্যই আসবে, ওই যে জুলাইয়ে কুমিল্লা গিয়েছিলে যে পোশাকে, ঠিক সেই পোশাকটাই পরে আসবে; মনে থাকে যেন...
-ফোন রাখার সঙ্গে সঙ্গে হাসতে হাসতে অসতর্কতাবশত শরীরে কফি ফেলে দিলাম অনেকখানি – পাপড়ি মেয়েটা এত সরল কেন; “ও” কেন বুঝলোনা পুরো ফোনালাপটুকই আমি ওর সঙ্গে মিথ্যাচার করেছি?-
ও কি জানেনা, আমি প্রকাশকের কাছ থেকে টাকার পরিমাণটা জেনে নিয়ে আর কখনই যোগাযোগ করিনি তার সাথে?ও কি জানেনা আজ সারাদিন আমি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে কাটিয়ে এলাম সেই পক্ষাঘাতগ্রস্ত মুক্তিযোদ্ধাটির বাড়িতে?ও কি জানেনা, বই প্রকাশের জন্য নানাভাবে যোগাড়কৃত পুরো ৩০হাজার টাকাই আমি এই দুস্থ মানুষটিকে দিয়ে এসেছি একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে?-উদ্দেশ্যটা খুবই সাদামাটা : আমি প্রাণপণে প্রচারণা চাই- সেটা বই লিখেই হোক, কিংবা দাতা(!) হিসেবেই হোক; তাই সেখানে পৌছামাত্রই যে দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি দৈনিকের স্থানীয় প্রতিনিধিকে খবর দিয়ে ঐ বাসায় এনেছিলাম, টাকা দেয়ার ছবিটি তুলে রাখতে, সেটা কি ও জানে? ধুর, ও কিভাবে জানবে, ‘ও’ সবজান্তা নাকি?আগামীকাল তো এমনিতেই পেপারে আমার হাস্যোজ্জ্বল ছবি দেখতে পাবে...
এই সিরিজের অন্য গল্পগুলো
সম্পূরক কোণ
লিখি চলো
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে মার্চ, ২০০৯ দুপুর ২:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



